গোলটেবিল বৈঠক ও আলোহীন আলোচনা : ইথিজা অবেরয়

সাহিত্য বাজার

Photo0287টক শো বা আলোচনা কিংবা গোলটেবিল বৈঠক এখন খুব চালু জিনিসি। টিভি দর্শক, এনজিও কর্মী ও সংবাদপত্র পাঠকদের কাছে এই শব্দগুলো অত্যন্ত পরিচিত। ইদানিং ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নিত্যনতুন টিভি চ্যানেলগুলোতে টক শো ছাড়া কোনো অনুষ্ঠান নাই। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে গভীর রাত অব্দি ‘লাইফ’ টক শো চলতেই থাকে। একই সঙ্গে রাজধানীতে প্রতিদিনই নানা নামের সংগঠনের উদ্যোগে যেখানে সেখানে যখন-তখন বিচিত্র বিষয়ে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের নাগরিক জীবনে আপাতত টক শো আর গোলটেবিল বৈঠকের দাপট লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আমাদের জীবনে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, দুঃশাসন, হতাশার মতো টক শো আর গোলটেবিল বৈঠকও অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
বলে রাখা ভালো, গোলটেবিল বৈঠকের টেবিলগুলো কিন্তু মোটেও গোল নয়। সরু, লম্বা, চৌকো তালগোল পাকানো সব টেবিল দিয়েই দিব্যি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে গোল হোক আর চৌকোই হোক গোলটেবিল বৈঠকের জন্য টেবিল একটা প্রয়োজন হয় বটে। বক্তার সামনে মাউথ পিস কিংবা মিনারেল ওয়াটার রাখার জন্য টেবিল প্রয়োজন হয়।
গোল হয়ে বসে কথা বলার ধারণা থেকেই সম্ভবত গোলটেবিল কথাটা এসেছে। এই গোলটেবিল আমাদের সমাজে কবে, কখন, কে বা কারা কোন ধান্দায় আমদানি করেছিলো, সেটা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। তবে গোলটেবিলের প্রচার এবং প্রসার বর্তমানে হু হু করে বাড়ছে। জিনিসপত্রের দাম যেমন বাড়ছে, যেমন বাড়ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সমস্যা।
টিভি টক শো আর গোলটেবিল বৈঠকে সব সময়ই অত্যন্ত গুরুতর গুরুগম্ভীর সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এসব আলোচনার সঙ্গে আমাদের প্রাত্যহিক বাস্তবতার খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও এসব উপাদেয় আলোচনার কথা শুনে আমরা মুগ্ধ হই, তৃপ্ত হই। এসব আলোচনা অনেকটা যে ব্যক্তি ভাত খেতে পায় না তার সঙ্গে বিরানির গুণাগুণ ও স্বাদ নিয়ে আলোচনার মতো। যাহোক, সাধারণত গোলটেবিল বৈঠকে অনেক মূল্যবান সব আলোচনা, পরামর্শ, উপদেশ নাজেল হয়। যদিও গোলটেবিলওয়ালাদের কথা কেউ কানে তোলে না। তারপরেও গোলটেবিল বৈঠক চলছে, হয়তো চলবেও। অভিজাত হোটেল কিংবা অন্য কোনো বিলাসবহুল কক্ষে অত্যন্ত দামি ও উপাদেয় সব খাদ্য সহযোগে অল্প কয়েকজন অনিচ্ছুক শ্রোতার সামনে বাঘা বাঘা ব্যক্তিরা যখন জনগুরুত্বসম্পন্ন কোনো বিষয়ের ওপর অতি গুরুত্বপূর্ণ সব বাণী উপহার দেন, তখন আনন্দে, সুখে গান গাইতে ইচ্ছে করে : জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো . . .।
আমাদের দেশের বক্তৃতাপ্রিয় নেতা নেত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টক শো ও গোল টেবিলওয়ালারা গলাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। টক শো ও গোলটেবিল আলোচনার কারণে নেতানত্রীদের ওপর অনেক চাপ পড়ছে। বক্তৃতাপ্রিয় নেতানেত্রীরা কর্মী-সমর্থকদের তোষামোদি-তদ্বির, চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি, ফিতা কাটা, সভা-সমাবেশ, দলের ভেতরে ও বাইরের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিকে ল্যাং মারার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি অন্বেষণ ইত্যাদি রুটিন ওয়ার্ক সেরে তারপর টক শো এবং হরেক রকম গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন। টিভি টক শো ও গোলটেবিলের ভারে এখন গোটা জাতি ভারাক্রান্ত। একটি-দুটি নয় কোনো কোনো দিন সাত-আটটি পর্যন্ত গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব বৈঠকে উপস্থিত মহামহিম ব্যক্তিরা দায়িত্বে থাকার সময় সম চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও গোলটেবিল আলোচনায় ঠিকই জাতির মুক্তির সনদ বাতলে দিচ্ছেন।
বিভিন্ন টক শো ও গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত বিদগ্ধ আলোচকদের মধুর সব বচন শুনে মনে পড়ছে একটি বিলাতি গল্প।
এক ব্যক্তির মাথায় গোলমাল দেখা দেয়ায় তাকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হলো। ডাক্তার ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই ব্যক্তির মাথায় অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। অপারেশন করার সময় সামান্য একটু অসাবধানতার কারণে ওই ব্যক্তির মাথার মগজের কিছু অংশ হঠাৎ ডাক্তারের হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। অগত্যা ডাক্তার ভদ্রলোক সেই অংশটুকু বাদ দিয়েই ওই ব্যক্তির মাথার খুলি জুড়ে অপারেশনের কাজ শেষ করলেন।
কয়েক বছর পর ওই ডাক্তার ভদ্রলোক রাজধানীতে এক গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে এসে দেখলেন, মগজ ছাড়াই মাথার খুলি জুড়ে দিয়ে তিনি যার অপারেশন করেছিলেন, ওই ব্যক্তিটিই বৈঠকের প্রধান অতিথি। বৈঠক শেষে ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করলেন- কেমন আছেন? অপারেশনের পর আপনার কোনো রকম অসুবিধা হচ্ছে না তো?
ব্যক্তিটি উত্তর দিলেন- নিশ্চয়ই না, আমি এখন বিভিন্ন টক শো ও গোলটেবিল আলোচনায় সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি! একইসঙ্গে একই সময়ে সাত চ্যানেলে ‘লাইভ’ শো করি!

(দুই)
আমাদের দেশে ভালো মানুষ, ভালো সংগঠন, ভালো উদ্যোগ, ভালো ভালো কথা কোনো কিছুরই অভাব নেই। তারপরও ভালো কিছু ঘটে না, ভালো কিছু দেখা যায় না। সারাদেশে খারাপের এতো বেশি সমারোহ যে পত্রপত্রিকাগুলো পর্যন্ত সুসংবাদ বড় বেশি খুঁজে পায় না। এ জন্য গণমাধ্যম কর্মীদের অনেক গলদঘর্ম হতে হয়। চিত্রজগৎ আর ক্রীড়াজগৎ থেকে ইতিবাচক সংবাদ ধার করতে হয়। আপাতত ছেলেমেয়ের বিয়ে. নাতি-নাতনীর জন্মের খবর ছাড়া আমাদের জীবনে তেমন কোনো সুসংবাদ নেই; কিন্তু এ গুলোকেও ঠিক সুসংবাদ বলা যায় না। এসব সুসংবাদের হাত ধরে দেশের জনসংখ্যা বাড়ে। আর বর্তমানে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই হার অব্যাহত থাকলে সব উন্নয়ন প্রচেষ্টাই যে ব্যাহত হবে অর্থনীতিবিদরা প্রায়শই আমাদের সেকথা মনে করিয়ে দেন। আপতত আমাদের দেশে একমাত্র সুসংবাদ হচ্ছে গোলটেবিল বৈঠক, টিভি টকশো, সেমিনার, আলোচনা, ডায়ালগ। বাংলাদেশে যেনো এসবের প্রাচুর্যের ঋতু শুরু হযেছে। নগরীর অভিজাত সব হোটেলে বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনে দেশ-বিদেশের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রিধারী জ্ঞানী-গুনী ব্যক্তিরা বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা সমাধানের ব্যপারে নিয়মিতই আলোচনা, গোলটেবিল, সেমিনারে অংশগ্রহণ করছেন। অংশগ্রহণকারী বিশিষ্টজনেরা গুরুত্বপূর্ণসব আলোচনা করেন, পরামর্শ দেন। এসব অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবীসহ দেশের বাঘা বাঘা সব ব্যক্তি উপস্থিত হন, আলোচনা করেন, পরামর্শ দেন, মতামত ব্যক্ত করেন। সভা-সমিতি, সেমিনার, আলোচনা, গোলটেবিল বৈঠকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ-গুরুত্বহীন সব বিষয় নিয়েই কমবেশি আলোচনা হয়। সমস্যার কারণ, উৎস, ফলাফল, প্রতিকারের উপায়, করণীয় ইত্যাদি বিষয়ও গভীর আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। এসব মূল্যবান আলোচনা-পর্যালোচনার ফলাফল শেষ পর্যন্ত শূন্য হলেও আলোচনা কিন্তু ঠিকই এগিয়ে চলছে। এমন কোনো দিন নেই যে দিন দুচারটা আলোচনা বা গোলটেবিল বৈঠক বা সেমিনার না হচ্ছে । হালকা বিষয় থেকে শুরু করে ভারি বিষয়, জাতীয়, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক, সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম-দর্শন, সাহিত্য ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে বিচিত্র আঙ্গিকে ও কলেবরে এসব আলোচনা হচ্ছে। শুধু বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনই এসব আলোচনার আয়োজন করছে না, এখন সরকার রাজনৈতিক দল, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও এমন কি সংবাদপত্রও এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে। সবাই শুধু আলোচনা করতে চায়, আলোচনার আয়োজন করতে চায়। এটা বর্তমানে শুধু ফ্যাশনই নয় প্যাসনও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব সভা-সেমিনার, আলোচনা, গোলটেবিল বৈঠক, টক শো মতবিনিময় ইত্যাদি অনুষ্ঠানে কাজের কাজ কিছু হোক না হোক প্রচুর ভালো ভালো কথা শোনা যায়। কথার মধ্যে যদি পুষ্টিগুণ থাকতো তাহলে আমরা সবাই এতো দিনে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে যেতাম। অপুষ্টির অস্থিত্ব এ দেশে আর থাকতো না। কিন্তু সমস্যা হলো কথার মধ্যে তা নেই। ফলে সব ভালো ভালো কথা ও মতামত শেষ পর্যন্ত কারো কোনো উপকারে আসে না। কাজেও লাগে না। যারা কষ্ট করে এ সব ভালো ভালো কথা বলেন, তারা গোপনে নগদ কিছু পেলেও পেতে পারেন, কিন্তু যারা শোনেন তাদের কোনো লাভই হয় না। যাদের জন্য এ সবের আয়োজন, তারাও এগুলোকে গ্রাহ্য করে না। তারপরও ভালো ভালো নামের সব সংগঠনের উদ্যোগে ভালো ভালো লোকের উপস্থিতিতে ভালো ভালো বিষয়ে ভালো ভালো কথার উচ্চারণ চলছেই। হয়তো চলবেও। আমাদের দেশে মানুষের চরিত্রে আশ্চর্য রকম স্ববিরোধিতা আছে। এখানে বেশির ভাগ মানুষ করে খারাপ, কিন্তু বলে ভালো। যে ব্যক্তি নিয়মিত ধর্ম পালন করেন তিনি নিয়মিত ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি ইত্যাদিও অত্যন্ত সচেতনতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করেন। পুকুরচুরি করে যিনি ধরা পড়ছেন, অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ধনকুবের হয়েছেন, সেও সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠকে গিয়ে চুরি বা অনৈতিকতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত ভালো ভালো কথা বলেন। চুরি করা, অনৈতিক সুবিধা নেয়া যে কতো খারাপ কাজ সে বিষয়ে অনেক যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। সবশেষ কেউ যেনো চুরি বা অনৈতিক সুবিধা না নেয়-এ বিষয়ে উপদেশ বিতরণ করেন।
আমাদের দেশে কেউই আসলে খারাপ হতে চান না, সবাই ভালো হতে চান। নাম চান, খ্যাতি চান। অর্থ, ক্ষমতা, ভোগ-বিলাস সবই চান। কিন্তু কেউ ভালো মানুষ হওয়ার জন্য যা করা দরকার তা করতে চান না। ভালো মানুষ হওয়ার সাধনা না করে ভালো মানুষ সাজতে চান। এ কারণে সামাজিক অনাচার দিন দিন বেড়েই চলছে।
এদেশে আসলে নীতিবাক্যটি হলো, চাচা আপন পরাণ বাঁচা। যে রাস্তায় গেলে আখেরে ভালো হবে, সেই রাস্তায় তোমার পূর্বপুরুষ তোমায় ঠেলে দিতে পারেন এবং তুমি যদি ঠিকমতো চলে থাকতে পারো তাহলেই তুমি সফল। এই পথে থাকলে তুমি চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ী, এমপি, মন্ত্রী, ডক্টর, প্লিডার, লিডার, সেক্রেটারি, ডিরেক্টর, কাউন্সিলার, কমিশনার, প্ল্যানার। অর্থনীতি পড়বে, দর্শন পড়বে, বড় বড় কোটেশন ঝাড়বে কিন্তু সাবধান, নিজের ঘড় সামলে। সমাজবাদ চাইবে, কিন্তু নিজে যে কোনো মূল্যে ধনী হওয়ার পর। ডেমোক্রেসি অবশ্যই ভালো জিনিস, উত্তম দৃষ্টিভঙ্গি, তবে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বা অটোক্রেসি বাঁচিয়ে। উপদেশ, নীতিকথা, আদর্শ সব কিছুই অন্যের জন্য। নিজের জীবনে ওসব ফলানো চলবে না। নিজেকে সব সময় ঝোপ বুঝে কোপ মারার বিদ্যায় পারদর্শী হতে হবে। যে কোনো মূল্যে, যেকোনা উপায়ে উপরে ওঠার ব্যপারে সিদ্ধহস্ত হতে হবে। জ্ঞানের কথা, ত্যাগের কথা, আদর্শের কথা হবে মুখের বুলি, তবে নিজের জীবনে তা পালনীয় নয়। এজন্য শকুনের দৃষ্টি চাই, শৃগালের বুদ্ধি চাই, সাধকের উদাসীনতা চাই। চাই আবছা অন্ধকার। আলোচনা, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠকের নামে এসবের চর্চাই বর্তমানে জোরেশোরে হচ্ছে। এটাকে বলা যায় মুখে মধু অন্তরে বিষ নীতি। তবে এ নীতি দিয়ে আর যাই হোক সুন্দর সমাজ গড়া যায় না। সামাজিক অনাচারও তাতে কমে না। সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য দরকার বাইরে-অন্তরে-মুখে সবখানে মধুর সমাহার। কথায় কাজে মিল, যা আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে নেই বললেই চলে। তাই তো আমরা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে দেখি, যাদের মুখে ভালো কথার খই ফোটে, তাদের সমর্থন, সহযোগিতায়, অনেক সময় তাদের হাতেই জাতির সর্বনাশের দলিল রচিত হয়। তাইতো সভা-সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক-মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যেসব ভালো ভালো কথা বলা হয়, শেষ বিচারে তা কতটুকু ভালো সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

Print Friendly