গণতন্ত্রের অভিযাত্রা : নিশ্চিত সংঘাতের পথে বাংলাদেশ

সদানন্দ সরকার

Begum jiaরক্ত চাও, রক্ত নাও

যদি চাও জীবন কিম্বা জান

তাও দেব। এ দেহের শেষবিন্দু রক্ত দেব

তুমি শুধু দাও একটি বিশুদ্ধ অভিযান।

 প্রয়োজনে আরো দেব

১৬ কোটি দেহের ঘাম

হাজার-কোটি প্রাণ দেব

তোমার জন্য বলিদান।

বিনিময়ে তুমি দিও শান্তিপ্রিয় দেশটা আর

সত্যিকারের গণতন্ত্রের মান।

২৭ ডিসেম্বর, শুক্রবার বিরোধী দলিয় নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিডিও বার্তাটি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে – হয়ত তিনি এখন গৃহবন্দি এবং শারীরিকভাবেও হয়ত বন্দি হতে যাচ্ছেন।

sheikh-hasina-1-sizedএকই দিন গোপালগঞ্জের জনসভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করার আহ্বান শুনে এ কথা নিশ্চিত বলা যায় যে, সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে এবং গণতন্ত্রের মানসকন্যা খ্যাত নেত্রী এখন গণতন্ত্রের হত্যাকারী হতে যাচ্ছেন। ধিক্ এমন মানসকন্যাকে। ইতিহাসে তাকে এখন থেকে গণতন্ত্রের মৃত্যুকন্যা হিসেবেই চিহ্নিত করা হবে। এটাও নিশ্চিত বলা যায়। কারণ, উচ্চশিক্ষিত হবার সুবাধে দেশবাসী তার কাছেই বেশি উদারতা আশা করেছিল।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকার পক্ষের আচারণ এতোটাই প্রশ্নবিদ্ধ যে, আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার আর কোনো সুযোগই থাকলো না। তাদের (মাহজোট নেতাদের) প্রতিটি বক্তব্য, কর্মকাণ্ড স্ববিরোধী বলেই প্রমানিত হচ্ছে বারবার। তাদের প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপই কুটিলতা দোষে দুষ্ট বলা যায়।

অবশ্য ইতিহাসের দিকে তাকালে এ প্রমাণ আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা অপ-রাজনীতিতেই বেশি দক্ষ তা দেখা যায় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে তারা এরশাদের সাথে নির্বাচনে অংশ নেন। যা ছিল গণতন্ত্রের আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। সে সময় বেগম জিয়া আপোষহীন নেত্রী উপাধী গ্রহণ করেন।

২য় কুটকৌশলের প্রমাণ পাওয়া যায় জামায়াতে ইসলামের সাথে ঐক্য গড়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে লগি বৈঠার আন্দোলনে ৫৬ জনকে পিটিয়ে হত্যা। একইসময় নির্বাচনে জয়ী হয়েই গোলাম আযমের পা ছুঁয়ে সালাম করতে তার বাসায় যাওয়া। তখন কি তিনি রাজাকার লিডার গোলাম আযম ছিলেন না?

পরবর্তীতে ২০০৬ এর নির্বাচনে জয়ী হয়েই মঈন ইউ বাহিনীর সাথে বৈঠক এবং তাদের নিরাপদে দেশত্যাগে সাহায্য করা ও নিজেদের সব মামলা তুলে নিয়ে তারেক ও কোকোসহ বিএনপি নেতাদের মামলাগুলোকে আরো বেশি ভয়াবহ করে তোলা। ২০০১ এ ক্ষমতায় এসে বিএনপি একটু চেষ্টা করলেই তাদেরকে ভোলার (স্মৃতিকণা বিশ্বাস পরিবার) বা রমনার বোমা হামলা মামলায় জড়িয়ে দিতে পারতো। আজ যেটা তারা করছেন। কোনো তদন্ত ছাড়াই সবকিছুতেই বিএনপি নেতাকর্মীদের জাড়িয়ে দিচ্ছেন অনেকটাই হাস্যকর ও অযোক্তিক মামলায়।

সর্বশেষ তাদের কুটচালের প্রমাণ পাওয়া যায় এই যুদ্ধপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রমে। আগে থেকেই হিসেব করে করে ঠিক এমন একটা সময় এই বিচারকার্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যে সময়ে দেশে নির্বাচনের সাথে এই বিচার কার্যক্রম যুক্ত হবে। এটা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও নির্লজ্জ উস্কানী। যে বিচারকার্যে ব্যরিষ্টার আমিরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন-এর মতো আন্তর্জাতিক বিচারকরা স্থান পেলেন না। যে কারণে এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারছে বিরোধী দল। বিরোধীদল বিএনপিকে কোনঠাসা করার লক্ষেই এই বিচার কার্যক্রমের কাজ শেষ মূহুর্তে শুরু করা হয়েছে এটা এখন পরিস্কার। কারণ বিএনপি বরাবরই আন্দোলনে মাঠে দূর্বল ও ভদ্র একটা দল হিসেবেই জাতির কাছে পরিচিত। তাদের আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে শরিকদল বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামের ভূমিকাই মূখ্য। যে কারণে আওযামী লীগও ভীত। নিন্দা করুন আর ঘৃণা করুন- এ সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, জামায়াতে ইসলাম্-ই একমাত্র রাজনীতিক দল যাদের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা আছে ও যারা সুশৃঙ্খল একটি দল। তাই এ দলটির এদেশে টিকে থাকা আওয়ামী লীগের মত পরিবারতন্ত্রে বিশ্বাষী দলগুলোর কাছে এমনিতেই ক্ষতিকর। জোটভূক্ত না হলে বিএনপিও এ দলটিকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইতো। এখানে বলা যায় যে এই জোটের রাজনীতি কিন্তু ছোটোদলগুলোর মেরুদন্ড একদম গুড়িয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে ইনু ভাইয়েরা কিন্তু আর নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারবেন না। তাই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হলে আগে নিজেদের সক্রিয়তাকে ফিরিয়ে আনুন। এই জোটের রাজনীতি বন্ধ করে সত্যিকারের গণতন্ত্রের চর্চায় জাতীয় ঐক্য গড়ুন।

যুদ্ধাপরাধী ইস্যু-এটাও আওয়ামী লীগের একটা নগ্নচাল হত। যদি না ব্লগার বন্ধুরা কয়েকজনের রাস্তায় নেমে এসে ঢাকার শাহবাগে প্রজন্ম চত্বর তৈরি না করত। আর তাইতো মজার খেলা খেলতে যেয়ে নিজের ফাঁদে আটকে গেলেন মহাজোট নেতারা। গণজাগরণ মঞ্চ তরুণরা বেশিরভাগ বাম ঘেষা হওয়ার কারণে তাদের সমর্থন দেয়ার চেষ্টাও করলেন কিছুদিন। কিন্তু সম্প্রতী তারা পাকিস্তান বিরোধী শ্লোগান তোলার কারণে পুলিশ বাহিনী দিয়ে তাদের থ্যাঙ্গাতেও ছাড়লেন না। হয়ত ভবিষ্যতে তারা যদি এ আন্দোলন অব্যাহত রাখে, তবে গ্রেফতারও হতে পারেন। কারণ ক্ষমতা লোভী মহাজোট ক্ষমতা আকঁড়ে থাকতে যেকোনো পথ অবলম্বন করতে পারে। যেকোনো মূহুর্তে জামায়াতে ইসলাম ১৮ দলিয় জোট ত্যাগ করে মহাজোটে যোগ দিলেই এই গণজাগরণ মঞ্চকর্মীরা শত্রু হয়ে যাবেন, এটা এখন নিশ্চিত বলা যায়। ইতিহাসও তাই বলে।

তারা দাবী করেন যে, তারা তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে দেয়া অঙ্গীকার পূরণ করছেন। অথচ সন্ত্রাস দুর্নীতি দমনের এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গিকার তারা করেছিলেন তার কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। নির্বাচনী ইস্তেহারে বিশেষভাবে সম্পদের হিসাব দেয়ার কথা বলা হলেও বিগত সাড়েচার বছরে সে হিসেব কখনো প্রকাশ পায়নি। উল্টো দুর্নীতি দমন সংস্থাকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে বলায়- এ বিষয়টি একেবারে বস্তাবন্দি হয়ে গেল।

আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের নির্বাচনী ইস্তেহারের এই যুদ্ধাপরাধী বিচার ছাড়া আর কোনো অঙ্গীকার কি পালিত হয়েছে? দেশ ও জাতির সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা যদি এটাকে বলা না যায় তবে আর কি বলা যায়?

তাদের নেতাকর্মী, এমপি মন্ত্রীদের সম্পদের হিসেব দেয়াতো দূরের কথা, সম্প্রতী টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে ৫ বছরে তাদের সম্পদের যে হাজারোগুন বৃদ্ধির হিসাব প্রকাশ পেয়েছে, তা মিথ্যে প্রমাণ করতে তারা এখন উঠে পড়ে লেগেছেন টিআইবি গবেষকদের পিছনেও। নির্বাচন কমিশন ভুলবসত কিছু প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণী দেয়ায় সেটাকেও এখন ট্রাপে ফেলে মুছে দিচ্ছেন।

isসংবিধান লংঘনের দোহাই দিয়ে নিজেরাই বারবার সংবিধান ভাঙ্গছেন বদলাচ্ছেন, আর বরছেন- সংবিধান থেকে একচুলও নড়বেন না। একদিকে বিরোধী দলের সাথে আলোচনা চালাবার ভান করছেন অন্যদিকে ১৫৪ জনকে নির্বচিত ঘোষণা করছেন সংবিধানের দোহাই দিয়ে। কি হাস্যকর তামাশা দেশ ও জাতির সাথে? যে তামাশার অন্যতম শিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। অনেকেই ভাবছেন স্বৈরাচার এরশাদ না বলে এখন তাকে কেন এতো সম্মান দেখালাম? এর উত্তরে বলবো- যারা তাকে স্বৈরাচার ও বিশ্ব বেহায়া আখ্যা দিয়ে টেনে হেঁচড়ে ক্ষমতাচ্যূত করার দাবীদার, সেই তারাই এখন তাকে দলে টানার প্রতিযোগীতায় নেমেছেন। তাদের শাসনাকালে তারা প্রমাণ করেছেন যে এরশাদ নয় বরং তারা দুজনই সমান স্বৈরাচারী। দুজনই এরশাদের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতালোভী। কেননা, একজন মিলন ও নূরহোসেনের লাশ রাষ্ট্রপতি এরশাদকে অনুশোচনায় ফেলেছিল, তাই সে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। কিন্তু ২০০ লাশ দেখেও আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নেত্রীদের ক্ষমতা গ্রহণের লোভ সংবরণ হয়নি। কেউ কোেো ছাড় এখন পর্যন্ত দেননি। এক কথায় বলা যায়, এরা দুজনই সমান ক্ষমতা লোভী। এদের রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার রাচনীতি।

‘মানুষ মরছে-মরুক

রক্ত ঝরছে ঝরুক’

তাতে নেতা-নেত্রীদের কিছু যায় আসে না। বিগত ৫ বছরে বিএনপি জনতার দাবি নিয়ে কোনো আন্দোলনে নামেনি। নির্বাচন আর তত্ত্বাবোধায়ক সরকার ইস্যু ছাড়া আর কোনো আন্দোলন তারা করেনি।

পরিশেষে বেলবো : সম্প্রতী একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ না করলেই নয়। গত২০ ডিসেম্বর বেগম জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের ৬ ঘণ্টা পরে বাংলা মটরের পুলিশ ভ্যানে বর্বরোচিত বোমা হামলার নিন্দা জানিয়ে বলতে চাই, এর সাথে কারা বা কে জড়িত তা অতিসত্ত্বর তদন্ত করে বের করুন। এভাবে হুট করে তদন্ত ছাড়াই কোনো রানৈতিক দলের ঘাঢ়ে দোষ চাপিয়ে তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করাটা আরো জঘন্য অপরাধ। এতে খুনীদের আরো উৎসাহিত করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন ও যৌথবাহিনীর ভাইয়েরা মনে রাখুন, আপনারা পুরো জাতির সেবক। কোনো রাজনৈতিক দলের চাকর না। আপনাদের বেতন ভাতা রাজনৈতিক দল দেয় না, এ দেশের জনগণ তাদের কস্টে উপার্জিত টাকা থেকে প্রদান করে আসছে। তাই দয়া করে ভাবুন এটা কারা করেছে? কেন? কি উদ্দ্যেশ্য। আপত দৃষ্টিতে এটাকেও সরকারের ষড়যন্ত্র মনে হচ্ছে আপনাদের ধর-পাকড় নমূনায়। এই সন্দেহ কি তবে সত্যি? সত্য কেউ না জানলেও আপনারা ঠিকই জানেন। আর জানেন ঈশ্বর – আল্লাহ বা ভগবান।

Print Friendly