কবি সুনীল নাথ স্মরণে বিভিন্ন কোরাস : ওমর কায়সার

সাহিত্য বাজার

কবি সুনীল নাথ স্মরণে বিভিন্ন কোরাস : ওমর কায়সার
image_44_8135
আমরা বিপুল হলে হাত ধরে হেঁটে যাব
পুরোনো গলির দিকে
বাসা পাবো, পাবো কি তারপর?
মানুষ মানুষ রবে, স্মৃতি ভুলে সুখী হবে
অসতীরা বাঁধবে কি ঘর? – সুনীল নাথ

জনারণ্যে একা একটি বাঘের মতো জীবন যাপন করতেন কবি সুনীল নাথ। আক্ষরিক  অর্থেই তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। যেন জগতে যা কিছু ঘটে যাচেছ, কে এল আর কে গেল, কারা কোথায় ভেঙ্গে চুড়ে যাওয়া ভাণ্ড লুটে পুটে খাচ্ছে, কারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে দাপিয়ে বেড়াচেছ Ñ ওসব কিছুই তার অনুষঙ্গে ছিল না। তার জীবনাচরণ দেখলে এরকমই মনে হতো সবার। কিন্তু মানুষটি সব কিছু থেকে দূরে থেকে, ভোগের দুনিয়াটা থেকে নিজেকে আলাদা ক’রে এই পৃথিবীর চারপাশ সবসময় প্রদক্ষিণ করেছেন এবং নিবিড় অবলোকন করেছেন আমাদের সময়কে। এবং তা অবশ্যই কবিতার মাধ্যমে। উনি বলতেন, কবির কাজ নয় আলোকসজ্জিত মঞ্চে দাঁড়ানো, দলবাজী করা, প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠানের পেছনে পেছনে লোল জিহ্বা বের ক’রে  কুকুরের মতো দৌঁড়ানো। তাই তিনি আজীবন কবিতার সাধনা ছাড়া অন্য কিছু করেন নি। কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠা, কোনো চাকুরী বাকুরি, কোনো সংসার তাকে টানে নি। একমাত্র কবিতাই তাকে টেনেছে। আশ্চর্য নির্লোভ, নিরাভরণ এক অসম্ভব সাদামাটা জীবন সাঙ্গ করে কবি সুনীল নাথ দেখিয়ে গেছেন Ñ কবিকে এই ভাবে  বাঁচতে হয়।
কবি সুনীল নাথ প্রথমে ‘মনন’ এবং পরে ‘মফস্বল’ নামে ছোট কাগজ প্রকাশ করতেন। সেখানে তার স্টাবলিশমেন্ট বিরোধী এবং সাম্যবাদী চিন্তার প্রতিফলন ঘটতো। এছাড়া নির্দিষ্ট সময় অন্তর এক একটা কবিতার বই বের করে যেতেন। প্রতিটা বইয়ের শিনোণামেই জীবনের এক একটা দিক যেন উম্মোচিত হতো পাঠকের কাছে। কোলাহলে তিনি যেতে পছন্দ করতেন না। একধরণের স্বেচ্ছা নির্বাসনের জীবন তিনি কাটিয়েছেন নন্দন কাননের গোলাপ সিংহ লেনের নিভৃত ঘরে। তার প্রতিবেশিরা বলছেন, নন্দন কাননের গোলাপ সিং লেনের প্রকৃত গোলাপটির এত সৌরভ ছিল আগে বুঝিনি। এখন তার ফেলে যাওয়া কাব্যের সৌরভ আমাদের বহুদিন আমোদিত করবেন।
সুনীল নাথ নিজে একা থাকতেন, বিচ্ছিন্ন থাকতেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় এই যে তিনি এই শহরের ব্যস্ত পরস্পর বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোকে এক করে গেছেন।  গত এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখ ঢাকার একটি হাসপাতালে তার মৃত্যুর পর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে চট্টগ্রামের কবি, গল্পকার, নাট্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা সবাই যেন আবার এক কাতারে এসে দাঁিড়য়েছে। নগরীর কোলাহলের মধ্যে সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত থাকে। কালে ভদ্রে এর ওর দেখা মেলে, কিন্তু সুনীল দা’ মারা যাওয়ার খবর পাওয়ার সাথে সাথে সেদিন বিকেলে তার নন্দন কাননের বাসভবনে, চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে মুহূর্তের মধ্যে সবাই হাজির হয়েছে। ক্রিয়েটিভ ওয়ার্কশপ, মধ্যাহ্ন,পুস্পকরথ, বলাকা, ঘুড়ি, খড়িমাটি, ঋতপত্র সহ আরো বেশ কয়েকটি লিটলম্যাগাজিন তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন করে। সেদিন দিনের শেষে চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় কবির কফিন। এক সংক্ষিপ্ত অঘোষিত সমাবেশে বাকরুদ্ধ কণ্ঠে অনেকেই কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সেদিনই কবির দেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার পৈতৃকভূমি ধলঘাটে। এর পরপরই কবি ও শিল্পী খালিদ আহসানের সার্বিক তত্ত্ববধানে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের পক্ষ থেকে তার জন্য শোক সভার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের জন্য কবি অভিক ওসমানকে আহ্বায়ক ও কবি কামরুল হাসান বাদলকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠণ করা হয়। এই কমিটির উদ্যোগে গত ২মে ইসলামাবাদ মেমোরিয়াল হলে কবির জন্য নাগারিক শোক সভার আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ প্রলম্বিত এই শোক সভায় চট্টগ্রামের বহু গুনী ব্যক্তি সুনীল নাথের জীবন কর্মের মূল্যায়ন করেন। এর কয়েকদিন পর ৫ মে ধলঘাটে কবির গ্রামে কবির শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানকে ঘিরে  এক অসাধারণ আয়োজন হয়ে গেল। গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে কবির কবিতা পাঠ, কবিকে নিবেদিত কবিতা পাঠ, কবির সমাধিতে বৃক্ষের চারারোপন সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন স্মরণযোগ্য সেই অনুষ্ঠানের কথা সেখানে উপস্থিত কবিরা বলেছেন। কবি সুনীল নাথ আমাদের চট্টগ্রামে কতটা যে প্রিয় ছিল তা তার মৃত্যুর পরই বোঝা গেছে। তার মৃত্যুর একমাসের মধ্যে চারপাঁচটা শোকসভা হয়ে গেল। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরেকটা আয়োজন করেছে বলাকা প্রকাশন। গত ১৬ মে চট্টগ্রামের ইসলামাবাদী মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত এই সভায় চট্টগ্রামের প্রায় সব কবিই উপস্থিত ছিলেন। এই দিন বলাকা ‘কবি সুনীল নাথ স্মরণে- শ্রদ্ধার্ঘ’ শিরোণামে একটি স্মরনিকাও প্রকাশ করেছে। এতে কবির সম্পর্কে অনেকের মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে।
কবি সুনীল নাথ যা বিশ্বাস করতেন , তাই বলতেন। যা বলতেন, তাই করতেন। কথা আর কাজের মিল ছিল তার। এরকম আচরণ আজকাল বড়ই দুর্লভ। এই পোষাকী জগতে তিনি ছিলেন একেবারেই অপোষাকী। তার স্টাবলিশমেন্ট বিরোধীতা, আজীবন প্রান্তে পড়ে থাকা, প্রচার বিমুখতার কারণে অনেকেই হয়তো তার সম্পর্কে জানেন না। তাই পাঠকের কৌতুহল মেটানোর জন্য এখানে তার কাব্যগ্রন্থগুলোর নাম উল্লেখ করতে চাই। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘প্রতিপক্ষ আয়না’। এরপর একে একে বের হয় সর্বনাশা নিমতোতা, বন্ধুর সময় সঙ্গে, বিস্তর সময় লেগেছে, আজো হিম হলে ছেলেবেলা রোদে ফেলে রাখি, শিউলি ঝরার মতো, রোদ নেচে নেচে যায় মেঘেরে ঘোমটা পরে, পাখির তৃষ্ণা নদীতে সাঁতার কাটে, মানবিক ভুলগুলো দুঃখগুলো।

কবি সুনীল নাথের কাব্যের মূল্যায়ন এই স্বল্প পরিসরে লেখায় সম্ভব নয়। তবু বাংলা কবিতার পাঠকদের জন্য তার সম্পর্কে কয়েকজন কবির মূল্যায়ন তুলে ধরছি।

কবি অরুণ দাশ গুপ্ত
‘সে অন্তর্গতভাবে যে কবি ছিল তা অনুভব করেছি। কবিতাতেই ছিল তার নিবেদন। নিবেদিত ছিল বলে কবিতা লেখাকে সে আন্দোলন হিসেবেই ধরে নিয়েছিল।

কবি স্বপন দত্ত
সুনীল নাথ নামের একজন কবি বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই লিখেছিলÑ একটি বুলেট এনে দিতে পারে মু্িক্ত ও স্বাধীনতা। একটি বুলেট ছোট্ট একটি কবিতা।

কবি খুরশীদ আনোয়ার
প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা সংবেদনশীলতার জারকে জারিত করে সুনীল কবিতা লিখেছে।

কবি আবসার হাবীব
সুনীল মানব স্বার্থ আর কবিতা স্বার্থকে আলাদা করে দেখেন নি কখনো। তাই কবিতা ও তার আদর্শ একই বৃত্তের ভেতর দিয়ে গেছে। দেশ প্রেম কখনো নারী প্রেমকেও ছাড়িয়ে গেছে শুধুৃ নয়, প্রাধান্যও দিয়েছেন কবি সুনীল নাথ।

কবি খালিদ আহসান
ষাটের কবি সুনীল নাথ তখন ‘মনন’ করেছেন, পরে ‘মফস্বল’। চলনে, বলনে, মফস্বলের লোকের মত, কবিতায় রচনা ও নিরীক্ষায় পুরোটাই আধুনিক।

কবি মহীবুল আজিজ
নানা কারণে ‘প্রতিপক্ষ আয়নাই’ সুনীল নাথের প্রধান কাব্যসৃষ্টি। এখানে তার কাব্যচরিত্রের মূল স্বভাবটি প্রকাশিত। বলা যেতে পারে পরবর্তী দুটি গ্রন্থ তার প্রথম গ্রন্থেরই সম্প্রসারিত ক্ষেত্র। …..প্রথম গ্রন্থেই আমরা দেখতে পাবো স্মৃতি বিস্মৃতি, আলো অন্ধকারের এক জগতে কবি দাঁড়িয়ে, তার সারা অবয়বে উৎকীর্ণ এক বিমর্ষ বেদনা। সামাজিকতার উপকণ্ঠে কখনও তার কণ্ঠ শ্র“ত হয় তথাপি নিঃসঙ্গ এক দূরচারী অবস্থান তার।

কবি আনন্দ মোহন রক্ষিত
কবি সুনীল নাথ যত বড় মাপের কবি সে তুলনায় তাঁর প্রচার এবং প্রসার মোটেও হয়নি। জাতীয়ভাবে তো কোনো মূল্যায়নই হয় নি। এমনকি স্থানীয়ভাবেও তাকে তেমন মূল্যায়ন করা হয় নি। তার সাথে কথা বললে বোঝা যেত তিনি ভীষণ অভিমানী ছিলেন।

কবি অভিক ওসমান
সুনীল নাথ কবিতা যেমন রোমান্টিক, স্বপ্নীল, সুখী তার কাব্যরমণী মাধবীতুল্য পরীর মত সুন্দর। কিন্তু কবির সাথে কবির জীবনের বিস্তর ফারাক। এখানেই কবির সাথে নিঠুর জীবনের মেলবন্ধন হয় না।

কবি সনজীব বড়–য়া
সবকিছু টাইমলি হয়ে যাবেÑসুনীলদার মুখের বিখ্যাত এই উক্তি তিরিশ বছরেও ছিল অম্লান। সুনীলদার জীবনে সব কিছু টাইমলি হয়নি। এমনকি মৃত্যুটাও না।

Print Friendly