কণ্ঠশীলনের নতুন নাটক ‘যা নেই ভারতে’: ভিন্ন দৃষ্টিতে মহাভারত

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাহিত্য বাজার

Ja-nei-bharote-photo-2

নাটকের কথা
মহাভারতের শুরুতেই আছে ‘যা নেই ভারতে তা নেই ‘ভারতে’। অর্থাৎ মহাভারতে যা নেই ভারতে তার অস্তিত্ব নেই। ‘মহাভারত’ ভারতীয় সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্য যা অবচেতনে রোপন করে অর্থ, কাম, ধর্মের ধারণা। সেই মহাভারতের পটভূমিকায় নাটক ‘যা নেই ভারতে’।
মহাভারত আশ্রয় করে রচিত হলেও ‘যা নেই ভারতে’ নাটকে নাট্যকার গোটা ঘটনাপ্রবাহকে একটু অন্যরকমভাবে বর্ণনা করতে চেয়েছেন।
কুরুবংশের রানী তথা হস্তিনাপুরির রাজবাড়ির বধূদের কথাই ধরা যাক… তারা কেউ স্বেচ্ছায় মাল্যদান করেনি। ভীষ্ম যুদ্ধ করে তাঁর ভাই বিচিত্রবীর্যের হাতে তুলে দেন দুই নারী অম্বিকা ও অম্বালিকাকে। কারণ তিনি বিবাহ করবেন না। কিন্তু ভাই তরুণ বয়সে মারা যান। দেখা দেয় অস্তিত্বের সঙ্কট বংশরক্ষায়। ভীষ্ম অম্বিকাকে অনুরোধ করেন পুত্রসন্তান ধারণ করতে। অম্বিকার আকাক্সক্ষা তিনি ভীষ্মের সন্তানের মা হতে চান। ভীষ্মের বক্তব্য তিনি প্রতিজ্ঞাভ্রষ্ট হবেন না।
নারীকে সেই পুরুষের ইচ্ছার কাছে নতজানু হতে হয়। পুরুষের আদেশে, তার বিছানায় যাকে পাঠানো হবে তাকেই গ্রহণ করতে হবে। ব্যাসদেবের সঙ্গে অম্বিকার বলপূর্বক মিলন হয়। সে মিলনে ব্যাসদেবের প্রতি না তাকানোয় জন্ম হয় অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের। অম্বালিকার সঙ্গে মিলনে জন্ম নেন পাণ্ডু। দাসীর গর্ভে জন্মান বিদুর। ব্যাসদেব এদের সবার পিতা। গল্প এগিয়েছে এমনভাবেই মহাভারতের মূল কাহিনির শরীর ছুঁয়ে। পরবর্তী সময়ে পাণ্ডুর পুরুষত্বহীনতা ও বনবাসের সিদ্ধান্ত, গান্ধারির জরায়ু বিনষ্টকরণ, এসবের ফলে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবেলায় আবির্ভূত হন ঘোর তামাসাবৃত জন্মকথার পঞ্চপা-ব। এইসব মাতা, পুত্রদেরই আশা-আকাঙ্খা, জয়-পরাজয়, দর্শনের বিরোধ ও বৈপরিত্য নিয়েই ‘যা নেই ভারতে’।
মহাভারত এক বিশেষ কালখণ্ড। তার বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় কুরুক্ষেত্র মহাসমরে। তারপর একদিন দাবানল ছড়াল বনে। হাজার হাজার দামাল শিশুর মত আগুন দোল খাচ্ছিল গাছের মাথায়। ধৃতরাষ্ট্র সেই অগ্নি শিশুদের আলিঙ্গন করতে দুবাহু বাড়িয়ে ছুটেছিলেন। এসব নাটকের বাইরের কথা। সবটাই রহস্যাবৃত। রহস্যের বেড়াজাল ভাঙতে চেয়েছে ‘যা নেই ভারতে’ ।

কণ্ঠশীলনের নতুন নাটক ‘যা নেই ভারতে’- অর্থ, ক্ষমতা, কাম ও ধর্মের অধুনান্তিক ধারাভাষ্য, সংগোপনে চেতনার বীজ

ভীষ্ম পারে না যা, তা পারতে হবে অম্বিকাকে – শ্লেষপূর্ণ এই একটি উক্তি-ই বলে দেয় মহাভারতের নারীর অবস্থান। আর এই অবস্থানকে আরো বেশি জোরালো করেছে মনোজ মিত্রের ভিন্ন ভাবনার কাহিনী ‘যা নেই ভারতে’ নামক নাটকের দৃশ্যকল্পে। এ নাটকে কৌরবদের বীরত্ব বা বীরগাঁথাকে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। প্রশ্রয় পায়নি পান্ডু চরিত্রটির বীরত্বও। এখানে পান্ডু লম্পট, মাতাল, যার সন্তান জন্ম দেবার ক্ষমতা নেই। ভীষ্ম বীর বটে তবে রাজ্যক্ষমতা বা বংশরক্ষায় স্বার্থপর একটি চরিত্র। এখানে শকুনীর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নতুন চরিত্র কুঞ্চুকী, গান্ধারী পিতা সুবলরাজ ও ব্যাসদেব সয়ং। দেবতার দানে পঞ্চপাণ্ডবের জন্ম নিয়েও এখানে রয়েছে শ্লেষ। দেবতারা কেন পান্ডুকে না দিয়ে কুন্তিকে দান করলেন? এ নিয়েও ভিন্ন চিন্তার জন্ম দেয় নতুন এই মহাভারত। এখানে রাজনীতি ইঙ্গিত ও ব্যঙ্গ করে বর্তমানের মোড়লত্বকে।
০৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল মিলনায়তন জাতীয় নাট্যশালায় কণ্ঠশীলন প্রযোজিত নতুন নাটক ‘যা নেই ভারতে’-এর উদ্বোধনী মঞ্চায়ন দেখেছি। মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে বর্তমান সময়কে ধারণ করে নাটকটি রচনা করেছেন প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা মনোজ মিত্র এবং নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করছেন কণ্ঠশীলন প্রশিক ও নির্দেশক মীর বরকত।
এ নাটকের দৃশ্যায়নে প্রথমেই দৃষ্টি কাড়ে মঞ্চসজ্জা। খুবই সাদামাঠাভাবে দাবা বা পাশার ছকের হালকা ঝুলন্ত দেয়াল, দেয়ালের পাশেই দুটি রসি দিয়ে তৈরি সিঁড়ি, সিঁড়ির মাথায় সাপের আকৃতি বলে দেয় সাপলুডুকেও আঁকার চেষ্টা হয়েছে এই মঞ্চ পরিকল্পনায়। সাপ মানেই রাজনৈতিক কুটকৌশলের প্রতীক। আর তাই বলা যায়, জুনায়েদ ইউসুফের মঞ্চসজ্জাটি ছিল খুবই নিপূণ চিন্তার সার্থক প্রয়োগ। যা মূহুর্তের মধ্যে দর্শককে নিয়ে গেছে মহাভারতের শকুনীর পাশার কাছে। যদিও এ নাটকে শকুনী ক্ষণজন্মা। একইসাথে প্রসংশার দাবিদার এ নাটকের পোশাক পরিকল্পক আইরীন পারভীন লোপা এবং কোরিওগ্রাফার লিনা দিলরুবা শারমিন। যদিও কোরিওগ্রাফের কাজে কিছুটা সমন্বয়হীনতা ছিল, তবে সেটা প্রথম মঞ্চায়নের প্রথম অনাভ্যস্ততা বলেই মানা যায়। সঙ্গীত পরিকল্পক অসীম কুমার নট্ট ভালো কাজ করেছেন।  গীত রচয়িতা এ এফ আকরাম হোসেন ও কণ্ঠশিল্পী হানিফ মোহাম্মদ রতনও প্রশংসার দাবি রাখেন এ নাটকের সূচনায়। কারণ গীত দিয়েই শুরু হয়েছিল নাটকের প্রথম দৃশ্যপট। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সংগীতের আকর্ষণে পিনপতন নিরবতা ছিল জাতীয় নাট্যশালার পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে।
যেহেতু কণ্ঠশীলন আবৃত্তির সংগঠন তাই কণ্ঠের কাজে অর্থাৎ সংলাপ প্রেক্ষাপণ ছিল চমৎকার, তবে পাতকীনি চরিত্রসহ কয়েকটি চরিত্রের সংলাপে স্পষ্টতা বা পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি ছিল। কৌরবকে অনেকে গৌরব বলছেন বলে ভ্রম হচ্ছিল। ভ্রমর না ভোমর বলছেন বোঝা যাচ্ছিল না। তবে সব মিলিয়ে নাটকের মানদণ্ড উত্তীর্ণ এই প্রথম প্রদর্শনী অবশ্যই সফলতার দাবি রাখে। আর এ কথা স্বীকারও করলেন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান এর নব নির্বাচিত সভাপতি, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ও সাধারণ সম্পাদক আখতারুজ্জামান। তারা কণ্ঠশীলন কর্মীদের অভিনয়ের ভুয়সী প্রশংসার পাশাপাশি আগামীতে কণ্ঠশীলন যেন নিয়মিত নাটকের জন্য মঞ্চ পেতে পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন এই প্রতিবেদকের সামনেই।
যা নেই ভারতে নাটকের নির্দেশক মীর বরকত বলেন, নাট্যকার মনোজ মিত্র নাটকের মূল কাহিনি নিয়েছেন ‘মহাভারত’-এর প্রথম দুটি খণ্ড থেকে। এর সঙ্গে বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক রাজনীতির প্রোপটে নারীবাদ, সামাজ্যবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সন্নিবেশ করে লিখেছেন ‘যা নেই ভারতে’। বুদ্ধদেব বসুর মহাভারতাশ্রয়ী নাটক ‘তাপস্বী ও তরঙ্গিনী’ এবং ‘অনাম্নী অঙ্গনা’র শ্রুতিরূপ নির্দেশনা দিয়েছিলাম কয়েকবছর পূর্বে। এবারো ‘মহাভারত’ তবে কেবল শ্রুতিরূপ নয়, মঞ্চনাটক। প্রখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা মনোজ মিত্রের নাট্যদল ‘সুন্দরম’ কোলকাতায় এ নাটকটি মঞ্চস্থ করেছে। সেখানে নাট্যকার স্বয়ং অভিনয় ও নির্দেশনায় সম্পৃক্ত ছিলেন। এরূপ নাটকের নবরূপায়ন অনভিজ্ঞ নির্দেশকের কর্ম নয়। তবুও দুঃসাহসের অন্ত নেই। দীর্ঘদিন আবৃত্তি, শ্রুতিনাটক, শিশুতোষ প্রযোজনা এবং একটি মঞ্চ নাটকে নির্দেশনাকর্মের পূর্ব-অভিজ্ঞতা সম্বলে এই স্পর্ধা।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাঘব-বোয়ালদের ক্ষমতার দাপট, যুদ্ধোন্মাদনা, নারীর অবমাননা ইত্যাকার সমসাময়িক বিষয়াবলী প্রযুক্ত হয়েছে মূল নাটকের কিঞ্চিৎ সম্পাদনায়। নবীন আবৃত্তিকর্মীদের জীবনে প্রথমবারের মতো এমন একটি মঞ্চনাটকে অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে যা মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে হলেও ব্যাখ্যা ভিন্নতর-আধুনিক।

022
নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে রূপদান করেছেন : আব্দুর রাজ্জাক, একেএম শহীদুল্লাহ কায়সার, সোহেল রানা, সালাম খোকন, অনন্যা গোস্বামী, জেএম মারুফ সিদ্দিকী, নিবিড় রহমান, তনুশ্রী গোস্বামী, নাজনীন আক্তার শীলা, তাসাউফ-ই-বাকি বিল্লাহ রিবিন, সুমন কুমার দে, তৃপ্তি রানী মণ্ডল, শামীম রিমু, মিজানুর রহমান, মাহমুদুল হাসান, শাহানা রহমান, মেহেরুন্নেছা অনীক, শরীফ আব্দুল ওয়াহাব, রুহুন ওয়াসাতা, অমিতাভ রায়, অনুপমা আলম, প্লাবন রব্বানী ও ফারিয়া আক্তার সোমা।

Print Friendly